বর্তমান সময়ে ‘আহলে কোরআন’ (বা নিজেদেরকে কেবল কোরআনের অনুসারী দাবীকারী গোষ্ঠী, ইংরেজিতে যাদের প্রায়ই Quranists বলা হয়) একটি নির্দিষ্ট চিন্তাধারার দল। তাদের পরিচয়, উদ্দেশ্য এবং হাদিস ছাড়া কেন কোরআন মানা অসম্ভব—তা কোরআনের আরবী আয়াত ও অর্থসহ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বর্তমানে আহলে কোরআন দাবীকারী আসলে কারা?
আহলে কোরআন বা কেবল কোরআন কেন্দ্রিক ভাবধারার এ দলটি মূলত একটি বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় গোষ্ঠী।
-
ঐতিহাসিক পটভূমি: ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে (বিশেষ করে পাঞ্জাব ও ভারত-পাকিস্তান অঞ্চলে) এই চিন্তাধারার সূচনা হয়। আবদুল্লাহ চক্রালভী, আসলাম জিরাপুরী এবং পরবর্তীতে গোলাম আহমেদ পারভেজের মতো ব্যক্তিবর্গ এই মতবাদের সপক্ষে লেখালেখি করেন।
-
প্রধান আকীদা বা বিশ্বাস: তারা দাবী করে যে, ইসলামি শরিয়তের একমাত্র উৎস হলো কেবল ‘কোরআন’। তারা সকল সহিহ হাদিস, সুন্নাহ এবং ইমাম-মুজতাহিদদের ফিকহকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বা অগ্রাহ্য করে।
২. তাদের মূল উদ্দেশ্য কী?
তাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:
১. হাদিস ও সুন্নাহকে অপ্রাসঙ্গিক করা: ইসলামের দ্বিতীয় প্রধান উৎস হাদিসকে অস্বীকার করে দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি শিথিল করা।
২. মনগড়া তাফসির বা ব্যাখ্যা প্রদান: হাদিস না থাকলে কোরআনের আয়াতের একটি নির্দিষ্ট ও নির্ভুল ব্যাখ্যা থাকে না। ফলে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তি, যুক্তি বা যুগের প্রভাবে কোরআনের আয়াতের অপব্যাখ্যা বা মনগড়া অর্থ করার সুযোগ তৈরি হয়।
৩. ইবাদতের রূপরেখা পরিবর্তন: হাদিসকে বাদ দিয়ে কেবল কোরআনের শব্দ ধরে নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজের নিজস্ব ও অদ্ভুত নিয়ম বের করা (যেমন: কেউ কেউ বলে নামাজ কেবল ৩ ওয়াক্ত, বা নামাজের রুকু-সেজদার নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই ইত্যাদি)।
৪. ইসলামকে বিকৃত করা: বাহ্যিকভাবে “আমরা কেবল আল্লাহর কথা (কোরআন) মানি” এমন মুখরোচক কথা বলে সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করা।
৩. হাদিস বা রাসূল (সা.)-এর জীবনী ছাড়া কি কোরআন মানা সম্ভব?
না, কোনোভাবেই সম্ভব নয়। হাদিস ও সুন্নাহ ছাড়া কেবল কোরআন মেনে চলা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কারণ:
-
কোরআনে বিধান মূলনীতি আকারে (In Principle) দেওয়া হয়েছে, আর হাদিসে দেওয়া হয়েছে তার বাস্তব বিবরণ ও প্রয়োগ (Detailed Implementation)।
-
যেমন: কোরআনে বহু জায়গায় বলা হয়েছে ‘সালাত কায়েম করো’। কিন্তু কীভাবে সালাত পড়বেন, কয় ওয়াক্ত পড়বেন, রুকু-সেজদা কীভাবে করবেন—তার একটি বিবরণও কোরআনে সরাসরি নেই; এগুলো সবই রাসুল (সা.) হাদিসের মাধ্যমে শিখিয়েছেন।
৪. কোরআন থেকেই এর উত্তর ও দলীল (আরবী ও অর্থসহ)
কোরআন নিজেই ঘোষণা করে যে, রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ ও হাদিস ছাড়া কোরআন বোঝা ও মানা সম্ভব নয়।
দলীল ১: কোরআন ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব রাসূল (সা.)-এর
আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোরআনের অর্থ ও বিধান মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব মহানবী (সা.)-কে দেওয়া হয়েছে।
وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
উচ্চারণ: ওয় আনযালনা ইলাইকায যিকরা লি তুবাইয়িনা লিন্নাসি মা নুযযিলা ইলাইহিম ওয়া লাআল্লাহুম ইয়াতাফাক্কারুন।
অর্থ: “আর আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি জিকির (কোরআন), যাতে আপনি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দেন যা তাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে এবং যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।”
— (সূরা আন-নাহল, ১৬:৪৪)
(ব্যাখ্যা: রাসুল সা. কোরআনের ব্যাখ্যা হিসেবে যা স্পষ্ট করেছেন, তা-ই হাদিস। হাদিস না মানলে কোরআনের তফসির ও উদ্দেশ্য জানা অসম্ভব।)
দলীল ২: রাসূল (সা.) যা দেন তা গ্রহণ করা ফরজ
আল্লাহ তাআলা কেবল কোরআনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে বলেননি, বরং রাসূল (সা.) যা আদেশ করেন বা প্রদান করেন তা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ
উচ্চারণ: ওয়ামা আতাকুমুর রাসুলু ফাখুযুহু ওয়া মা নাহাকুম ‘আনহু ফানতাহু, ওয়াত্তাকুল্লাহ…
অর্থ: “আর রাসূল তোমাদের যা দেন তা তোমরা গ্রহণ করো, আর যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। আর আল্লাহকে ভয় করো।”
— (সূরা আল-হাশর, ৫৯:৭)
দলীল ৩: রাসুলের ফায়সালা বা হাদিস না মানলে ঈমানদার হওয়া যায় না
যেকোনো বিষয়ে বা বিবাদে রাসুল (সা.)-এর সিদ্ধান্তকে (যা হাদিসে সংসংরক্ষিত) সানন্দে মেনে নেওয়া ঈমানের শর্ত।
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
উচ্চারণ: ফালা ওয়া রাব্বিকা লা ইউ’মিনুনা হাত্তা ইউহাক্কিমুকা ফিমা শাজারা বাইনাহুম ছুম্মা লা ইয়াজিদু ফি আনফুসিহিম হারাজাম মিম্মা কাদাইতা ওয়া ইউসাল্লিমু তাসলিমা।
অর্থ: “অতএব, আপনার রবের কসম! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তারা আপনাকে তাদের পারস্পরিক বিরোধের বিচারক মেনে নেয়, অতঃপর আপনি যে ফায়সালা দেন সে বিষয়ে নিজেদের মনে কোনো দ্বিধা না রাখে এবং তা পূর্ণ সচ্ছন্দে মেনে নেয়।”
— (সূরা আন-নিসা, ৪:৬৫)
দলীল ৪: রাসূল (সা.) নিজ খেয়ালখুশিমতো কোনো ধর্মীয় বিধান দেন না
হাদিস অস্বীকারকারীরা বলে যে হাদিস মানুষের কথা। কিন্তু কোরআন বলছে রাসুল (সা.) দ্বীনের বিষয়ে যা-ই বলেন তা আল্লাহর প্রেরিত ওহী (ওহীয়ে গায়ের মাতলু)।
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ ﴿٣﴾ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ ﴿٤﴾
উচ্চারণ: ওয়ামা ইয়ানতিকু ‘আনিল হাওয়া। ইন হুওয়া ইল্লা ওয়াহইউই ইউহা।
অর্থ: “এবং তিনি (রাসূল) নিজ খেয়ালখুশি থেকে কথা বলেন না। তা তো কেবল ওহী, যা তাঁর প্রতি ওহীরূপে পাঠানো হয়।”
— (সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩-৪)
কোরআন ও হাদিস একে অপরের পরিপূরক। কোরআন হলো ‘আইন গ্রন্থ’ আর হাদিস বা রাসূল (সা.)-এর জীবনচরিত হলো সেই ‘আইনের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা’। তাই হাদিস বা রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহকে বাদ দিয়ে কেবল কোরআন মানার দাবী করা একটি অসম্পূর্ণ, বিভ্রান্তিকর ও অবাস্তব ধারণা।