রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আনীত বিধান ও সুন্নাহ অনুসরণ করা যে বাধ্যতামূলক, সে বিষয়ে পবিত্র কুরআনে অসংখ্য স্পষ্ট আয়াত রয়েছে। নিচে প্রধান কিছু আয়াত আরবি, বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ উপস্থাপন করা হলো:
১. সূরা আল-হাশর, আয়াত ৭
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِঅনুবাদ: “রসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।”
ব্যাখ্যা: এই আয়াতটি সুন্নাহ ও হাদিস মানার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম মূল ভিত্তি। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) সহ সমস্ত ফকীহ ও মুফাসসিরগণ একমত যে, রাসূল (সা.) শরীয়তের যেসব আদেশ ও নিষেধ দিয়েছেন, তার সবই মানা মুসলিমদের জন্য ফরজ।
২. সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬৫
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًاঅনুবাদ: “অতএব, তোমার রবের কসম! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের মধ্যকার বিবাদীয় বিষয়ে তোমাকে বিচারক মেনে নেয়, অতঃপর তোমার ফায়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং তা সর্বান্তকরণে মেনে নেয়।”
ব্যাখ্যা: আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে, কেবল মৌখিক স্বীকারোক্তিই ঈমানের প্রমাণ নয়। জীবনে যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ ও ফায়সালাকে বিনাদ্বিধায় চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করা ঈমানের অপরিহার্য শর্ত।
৩. সূরা আন-নিসা, আয়াত ৮০
مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَঅনুবাদ: “যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল।”
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং রাসূলের আনুগত্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। রাসূল (সা.) নিজের মনগড়া কিছু বলেননি, বরং আল্লাহর ওহীর মাধ্যমেই দ্বীন প্রচার করেছেন। তাই রাসূলের হাদিস বা হুকুম মানা সরাসরি আল্লাহরই নির্দেশ মানার সামিল।
৪. সূরা আল-ইমরান, আয়াত ৩১
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌঅনুবাদ: “বলুন (হে নবী!), তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তবে আমাকে অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
ব্যাখ্যা: এই আয়াতটিকে মুফাসসিরগণ “আয়াতুল ইবতিলা” বা ভালোবাসার পরীক্ষা নির্দেশক আয়াত বলেন। অর্থাৎ, কেউ যদি দাবি করে সে আল্লাহকে ভালোবাসে, তবে তার প্রমাণ হচ্ছে রাসূল (সা.)-এর হাদিস ও সুন্নাহ অনুসরণ করা।
৫. সূরা আন-নজম, আয়াত ৩-৪
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ – إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰঅনুবাদ: “আর তিনি নিজ ইচ্ছায় কোনো কথা বলেন না। এতো এক ওহী, যা তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়।”
ব্যাখ্যা: দ্বীনের বিষয়ে নবীজি (সা.) যা কিছু বলেছেন তা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহী। ওহী দুই প্রকার: ১. ওহীয়ে মাতলু (পবিত্র কুরআন) এবং ২. ওহীয়ে গাইরে মাতলু (রাসূলের হাদিস ও সুন্নাহ)। তাই হাদিসকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
৬. সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৩৬
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْঅনুবাদ: “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে ফায়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ বা মুমিন নারীর সে বিষয়ে নিজেদের কোনো সিদ্ধান্তের এখতিয়ার থাকে না।”
ব্যাখ্যা: যখনই কোনো বিষয়ে কুরআন ও হাদিসের স্পষ্ট হুকুম থাকবে, সেখানে কোনো ব্যক্তির নিজস্ব মতামত বা যুক্তি চালানের অধিকার থাকে না।
পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, কুরআনের বাণী শুধু মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একমাত্র দায়িত্ব ছিল না; বরং এর আয়াতগুলোর অর্থ, বিধান ও সঠিক প্রয়োগ মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া এবং শিক্ষা দেওয়াও তাঁর প্রধান দায়িত্বগুলোর একটি ছিল।
রাসূল (সা.) যে কুরআনের মূল ব্যাখ্যাদাতা, সে সংক্রান্ত কয়েকটি প্রধান আয়াত ও সেগুলোর ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সূরা আন-নহল, আয়াত ৪৪
وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَঅনুবাদ: “আর আমি আপনার প্রতি ‘জিকির’ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের জন্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে দেন যা তাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে এবং যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।”
ব্যাখ্যা:
-
‘লি তুবাইয়িনা’ (لِتُبَيِّنَ) পদের গুরুত্ব: আয়াতে বলা হয়েছে ‘লি তুবাইয়িনা’ অর্থ—”যাতে আপনি স্পষ্ট ভাষায় ব্যাখ্যা করে দেন।” আল্লাহ কেবল বলেননি যে “যাতে আপনি পৌঁছে দেন” (লি তুবাল্লিগা), বরং বলেছেন “ব্যাখ্যা করে দেন”।
-
কুরআনের ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা: কুরআনে অসংখ্য আদেশ সংক্ষেপে (مجمل) দেওয়া হয়েছে। যেমন—সালাত কায়েম করা এবং জাকাত দেওয়া। কিন্তু সালাতে কয় রাকাত পড়তে হবে, কীভাবে রুকু-সেজদা করতে হবে কিংবা জাকাতের নেসাব কত—কুরআনে এসবের বিস্তারিত বিবরণ নেই। রাসূল (সা.) তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে (হাদিসের সাহায্যে) এগুলো ব্যাখ্যা করে শিখিয়েছেন।
২. সূরা আল-জুমুআ, আয়াত ২
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَঅনুবাদ: “তিনিই নিরক্ষরদের মধ্যে তাঁদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে ‘কিতাব’ ও ‘হিকমাহ’ শিক্ষা দেন।”
ব্যাখ্যা:
-
তিনটি পৃথক দায়িত্ব: এই আয়াতে রাসূল (সা.)-এর তিনটি কাজের কথা বলা হয়েছে—
-
আয়াত তেলাওয়াত করে শোনানো (ইয়াতলু আলাইহিম)
-
আত্মশুদ্ধি করা (ইউঝাক্কিহিম)
-
কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেওয়া (ইউআল্লিমুহুমুল কিতাবা ওয়াল হিকমাহ)
-
-
‘আল-কিতাব’ ও ‘আল-হিকমাহ’ এর অর্থ: প্রখ্যাত মুফাসসির ও ফকীহ হযরত ইমাম শাফেয়ী (রহ.) সহ অধিকাংশ আলেমের মতে, ‘আল-কিতাব’ দ্বারা কুরআন এবং ‘আল-হিকমাহ’ দ্বারা সুন্নাহ বা হাদিস উদ্দেশ্য। শুধু কুরআন তেলাওয়াতই যথেষ্ট হলে “শিক্ষা দেওয়া” এবং “হিকমাহ” শব্দ দুটি আলাদাভাবে ব্যবহারের প্রয়োজন হতো না। হাদিসই হলো কুরআনের বাস্তব শিক্ষা ও প্রজ্ঞাময় ব্যাখ্যা।
৩. সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১৫১
كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولًا مِّنكُمْ يَتْلُو عَلَيْكُمْ آيَاتِنَا وَيُزَكِّيكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَঅনুবাদ: “যেমন আমি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসূল পাঠিয়েছি, যিনি তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করেন, তোমাদেরকে পবিত্র করেন, কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন এবং এমন বিষয় শিক্ষা দেন যা তোমরা জানতে না।”
ব্যাখ্যা:
-
আয়াতটিতে বলা হয়েছে, মানুষ আগে যা জানত না তা রাসূল (সা.) শিক্ষা দেবেন। এর অর্থ হলো, কুরআনের গভীর অর্থ, আহকাম ও বিধি-বিধানের পেছনের উদ্দেশ্য বুঝে নেওয়ার মতো জ্ঞান সাহাবিদের সরাসরি ছিল না। রাসূল (সা.) আল্লাহর নির্দেশে তা শিক্ষা দিয়েছেন।
-
রাসূলের শেখানো অর্থ ও প্রয়োগ ছাড়া কেউ যদি নিজের মতো করে কুরআন ব্যাখ্যা করতে চায়, তবে সে বিভ্রান্তিতে পড়বে।
৪. সূরা আন-নিসা, আয়াত ১০৫
إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُঅনুবাদ: “নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আল্লাহ আপনাকে যা দেখিয়েছেন বা বুঝিয়েছেন, সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করেন।”
ব্যাখ্যা:
-
এখানে বলা হয়েছে ‘বিমা আরাকাল্লাহু’—অর্থাৎ “আল্লাহ আপনাকে কুরআনের যে সঠিক সমঝ ও জ্ঞান দান করেছেন।”
-
নবীজি (সা.) যে বিচার-ফায়সালা বা ব্যাখ্যা দিতেন, তা মানুষের সাধারণ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ছিল না; বরং তা আল্লাহর প্রদত্ত জ্ঞানের আলোকেই হতো। তাই কুরআনের বিচার ও মীমাংসা বুঝতে হলে রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর শরণাপন্ন হওয়া ব্যতিরেক অন্য কোনো উপায় নেই।
সারসংক্ষেপ
পবিত্র কুরআন একটি মূলনীতি ও বিধানের কিতাব। আর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদিস ও সুন্নাহ হলো সেই মূলনীতির বাস্তব প্রয়োগ রূপ ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা।
কুরআনকে তার সঠিক মূলে বুঝতে হলে অবশ্যই রাসূল (সা.)-এর ব্যাখ্যা বা হাদিসকে মেনে নিতে হবে, কারণ স্বয়ং কুরআনই রাসূল (সা.)-কে এই ব্যাখ্যাকারীর পদে অধিষ্ঠিত করেছে।
যারা নিজেদের “আহলে কুরআন” বলে দাবি করেন (সাধারণভাবে হাদিস অস্বীকারকারী নামে পরিচিত), তারা শরিয়তের মূল উৎস হিসেবে কেবল পবিত্র কুরআনকে গ্রহণ করেন এবং হাদিস ও সুন্নাহকে বিধান হিসেবে অস্বীকার করেন।
নিচে তাদের উপস্থাপিত প্রধান যুক্তিগুলো এবং পবিত্র কুরআনের আরবি আয়াত, অর্থ ও ইসলামিক স্কলারদের দলিলভিত্তিক খণ্ডন তুলে ধরা হলো:
যুক্তি ১: “কুরআনেই সব কিছুর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ রয়েছে, তাই হাদিসের প্রয়োজন নেই”
আহলে কুরআনদের দাবি:
তারা সূরা আন-আমের ৩৮ নম্বর আয়াত এবং সূরা আন-নহলের ৮৯ নম্বর আয়াতকে নিজেদের পক্ষে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে।
مَّا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِن شَيْءٍঅনুবাদ: “আমি কিতাবে কোনো কিছু বাদ দেইনি।” (সূরা আন-আম: ৩৮)
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍঅনুবাদ: “আর আমি আপনার ওপর কিতাব নাজিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা হিসেবে।” (সূরা আন-নহল: ৮৯)
তাদের মতে, যেহেতু কুরআনে সব কিছুর বিবরণ আছে, তাই হাদিস গ্রহণ করা মানে কুরআনকে অপূর্ণ মনে করা।
খণ্ডন ও সঠিক ব্যাখ্যা:
১. কুরআনের সার্বিক প্রকৃতি ও মূলনীতি নির্দেশ: কুরআনে জীবন পরিচালনার মূলনীতি ও মৌলিক বিধানাবলী সংক্ষেপে ও পূর্ণাঙ্গভাবে দেওয়া হয়েছে। তবে বিস্তারিত বিধি-বিধান অনুসরণের দায়িত্ব রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর ওপর দেওয়া হয়েছে।
২. কুরআন নিজেই হাদিস মানার নির্দেশ দেয়: যে কুরআন প্রতিটি বিষয়ের ব্যাখ্যা দেয়, সেই কুরআনই বিশ্ববাসীকে নির্দেশ দিয়েছে রাসূল (সা.)-এর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলতে:
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُواঅনুবাদ: “রসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।” (সূরা আল-হাশর: ৭)
অতএব, যে ব্যক্তি হাদিস অস্বীকার করে, সে মূলত কুরআনের এই স্পষ্ট নির্দেশকেই অস্বীকার করে।
যুক্তি ২: “কুরআনের সুরক্ষার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন, হাদিসের নয়”
আহলে কুরআনদের দাবি:
তারা দাবি করে, আল্লাহ কেবল কুরআন সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, হাদিস সুরক্ষার নয়। তাই হাদিস সংকলনে ভুল বা জালিয়াতি থাকতে পারে।
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَঅনুবাদ: “নিশ্চয় আমিই ‘জিকির’ অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরাক্ষক।” (সূরা আল-হিজর: ৯)
খণ্ডন ও সঠিক ব্যাখ্যা:
১. ‘জিকির’ শব্দের অর্থ: আয়াতে ব্যবহৃত ‘আল-জিকির’ (الذِّكْرَ) শব্দটির ব্যাপক অর্থ রয়েছে। দ্বীনের সুরক্ষা বলতে মূল গ্রন্থ (কুরআন) এবং তার প্রয়োগিক ব্যাখ্যা (হাদিস)—উভয়েরই সুরক্ষাকে বোঝায়। হাদিস না থাকলে কুরআনের আমল বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
২. কুরআন ব্যাখ্যার দায়িত্ব রাসূলের: আল্লাহ কুরআন নাজিল করেছেন এবং তা বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব রাসূল (সা.)-কে দিয়েছেন:
وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْঅনুবাদ: “আর আমি আপনার প্রতি ‘জিকির’ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের জন্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে দেন যা তাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে।” (সূরা আন-নহল: ৪৪)
যদি ব্যাখ্যাই সংরক্ষন না থাকে, তবে মূল গ্রন্থের ওপর আমল করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মুহাদ্দিসগণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক নিয়মে (সনদ ও রাবী যাচাইয়ের মাধ্যমে) সহীহ হাদিসকে জাল হাদিস থেকে পৃথক করে সুরক্ষিত করেছেন।
যুক্তি ৩: “রাসূল (সা.) কেবল মানুষ ছিলেন এবং ওহী কেবল কুরআনই”
আহলে কুরআনদের দাবি:
তারা মনে করে, রাসূল (সা.)-এর নিজস্ব কোনো দৈনন্দিন কথা বা আদেশ শরিয়তের স্থায়ী উৎস হতে পারে না, কেবল কুরআনের লিখিত অংশই ওহী।
খণ্ডন ও সঠিক ব্যাখ্যা:
কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, রাসূল (সা.) দ্বীনের ব্যাপারে নিজস্ব মনগড়া কোনো কথা বলেননি। তাঁর প্রতিটি দ্বীনী নির্দেশই ওহী-ভিত্তিক (যা ওহীয়ে গাইরে মাতলু বা অপরঠিত ওহী নামে পরিচিত):
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ – إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰঅনুবাদ: “আর তিনি নিজ ইচ্ছায় কোনো কথা বলেন না। এতো এক ওহী, যা তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়।” (সূরা আন-নজম: ৩-৪)
রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ ও নির্দেশ সরাসরি আল্লাহর দেওয়া ওহীরই অংশ, তাই তা মানা বাধ্যতামূলক।
বাস্তবভিত্তিক ও বৈধানিক প্রশ্ন (আহলে কুরআনদের দৃষ্টিভঙ্গির অসারতা)
যদি হাদিস সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়া হয়, তবে ইসলামি শরীয়তের প্রায় সিংহভাগ আমলই অকেজো ও অস্পষ্ট হয়ে পড়ে:
১. নামাজের বিবরণ: কুরআনে আকিমুস সালাহ (نماز কায়েম করো) বলা আছে। কিন্তু ফজর ২ রাকাত, জোহর ৪ রাকাত, রুকু-সেজদার নিয়ম, তাশাহহুদ বা আততাহিয়্যাতু পড়া—এগুলোর একটিও কি সরাসরি কুরআনে লেখা আছে? এসব রাসূল (সা.) হাদিসের মাধ্যমে শিখিয়েছেন।
২. জাকাতের পরিমাণ: কুরআনে জাকাত দেওয়ার নির্দেশ আছে, কিন্তু সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বাহান্ন তোলা রুপা হলে শতকরা ২.৫% হারে জাকাত দিতে হবে—এই বিবরণ হাদিসেই এসেছে।
৩. হজ ও অন্যান্য বিধান: হজের তাওয়াফ কীভাবে করতে হবে, তাওয়াফ কত চক্কর, সাফা-মারওয়ার সাঈ বা পাথর নিক্ষেপের নিয়মাবলী সবই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
কুরআন নিজেই নির্দেশ দেয় যে, রাসূল (সা.)-এর বিচার ও সিদ্ধান্ত মেনে না নিলে কেউ মুমিন হতে পারবে না:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًاঅনুবাদ: “অতএব, তোমার রবের কসম! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের মধ্যকার বিবাদীয় বিষয়ে তোমাকে বিচারক মেনে নেয়, অতঃপর তোমার ফায়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং তা সর্বান্তকরণে মেনে নেয়।” (সূরা আন-নিসা: ৬৫)
সারসংক্ষেপ
আহলে কুরআনদের দৃষ্টিভঙ্গি কুরআনেরই বহু স্পষ্ট আয়াতের পরিপন্থী। কুরআন ও হাদিস দুটি পৃথক বা পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়; বরং কুরআন হলো মূল সংবিধান এবং হাদিস হলো তার প্রয়োগিক বাস্তবায়ন ও ব্যাখ্যা। হাদিসকে বাদ দিয়ে কুরআন মানার দাবি করা স্ববিরোধী ও বাস্তবসম্মত নয়।